প্রসেনজিৎ ধর, কলকাতা :- দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের পাস বিক্রি ঘিরে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে এবার কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে পুজোর পাস বিক্রি, সরকারি টেন্ডার এবং আর্থিক লেনদেন নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে রয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই তাঁর বাড়ি ও অফিস-সহ একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে ইডি। দু’দফায় সিজিও কমপ্লেক্সে হাজির হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী।ইন্দ্রনীলের দায়ের করা মামলার শুনানি প্রথমে বিচারপতি জয় সেনগুপ্তের এজলাসে হওয়ার কথা ছিল। পরে মামলাটি যায় বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের এজলাসে। শুনানিতে ইন্দ্রনীলের প্রভাব খাটানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, তৃণমূল সরকারের আমলে মন্ত্রী থাকায় তাঁর পক্ষে প্রশাসনিক স্তরে প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব ছিল কি না, তা তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মামলায় ‘মানি ফ্লো’-এর অভিযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন বিচারপতি। তদন্তের গতিপ্রকৃতি স্পষ্ট করতে রাজ্যকে একটি ফ্লো চার্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।আদালতে ইন্দ্রনীলের আইনজীবী দাবি করেন, তাঁর মক্কেল দুর্গাপুজোর প্রচার ও আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর কাজের প্রশংসাও করা হয়েছিল। প্রিভিউ শোয়ের পাস নিয়ে এর আগে কোনও অভিযোগ ওঠেনি বলেও দাবি করেন তিনি। ২০২৩ সালে প্রতিবন্ধী দর্শকদের জন্য বিনামূল্যে প্রিভিউ শোয়ের পাস দেওয়া হয়েছিল বলেও আদালতে জানান ইন্দ্রনীলের আইনজীবী।
এর পরেই বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, প্রিভিউ শোয়ের নামে পাস বিক্রি করার অনুমতি আদৌ ছিল কি না। রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে জানান, ওই পাসের জন্য ১৭ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হত। ইন্দ্রনীলের আইনজীবীর আরও বক্তব্য, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ তিনি মন্ত্রী হওয়ার আগেও ‘মাস আর্ট’ বিভিন্ন সরকারি কাজ করেছে এবং টেন্ডার পেয়েছে। প্রায় ৪০টি টেন্ডার পাওয়ার কথাও আদালতে জানানো হয়। তাঁর দাবি, ইন্দ্রনীলের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে কোনও বেআইনি টাকা পাওয়া যায়নি। ইডি একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালালেও উল্লেখযোগ্য কিছু উদ্ধার করতে পারেনি বলেও আদালতে সওয়াল করেন আইনজীবী। তবে আদালতের তরফে পাল্টা প্রশ্ন ওঠে, ইন্দ্রনীল কোনও বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলেন কি না এবং মন্ত্রী থাকাকালীন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় তাঁর কোনও প্রভাব ছিল না—তা কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে? বিচারপতি স্পষ্ট করেন, তদন্তের প্রক্রিয়া এভাবে থামিয়ে দেওয়া যায় না। এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রথমবার সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে হাজিরা দিয়েছিলেন ইন্দ্রনীল সেন। প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এরপর ৭ অক্টোবর ফের তাঁকে ডেকে পাঠায় ইডি। দ্বিতীয় দফার জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর গত ১০ বছরের আয়-ব্যয় এবং আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত নথি খতিয়ে দেখা হয় বলে সূত্রের খবর।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযোগ, নথিপত্র সামনে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও ইন্দ্রনীলের বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে। প্রথম দফার জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ইডির তদন্ত অনুযায়ী, ইউনেস্কোর নাম ব্যবহার করে দুর্গাপুজোর প্রিভিউ শোয়ের পাস বিক্রির মাধ্যমে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এই মামলায় ইন্দ্রনীলের বাড়ি, অফিস-সহ প্রায় ১৫টি জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়েছিল। পাশাপাশি সরকারি টেন্ডারের নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার কাজ তাঁর ঘনিষ্ঠদের সংস্থাকে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও তদন্ত করছে ইডি। তদন্তকারী সংস্থার আরও দাবি, ইন্দ্রনীলের মালিকানাধীন ‘অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩.৮ কোটি টাকার বেশি নগদ জমা পড়েছিল। ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল বলেও ইডির তরফে দাবি করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। গ্রেফতারির আশঙ্কার মধ্যেই হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়ে আপাতত আইনি রক্ষাকবচ পাওয়ার চেষ্টা করছেন প্রাক্তন মন্ত্রী।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal