প্রসেনজিৎ ধর, কলকাতা :-বিশ্বজুড়ে ক্রমশ বাড়ছে সামুদ্রিক উত্তেজনা। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত থেকে লোহিত সাগরের অস্থিরতা—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলিতে নিরাপত্তার প্রশ্ন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের দীর্ঘ উপকূলরেখা, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি সম্পদের সুরক্ষায় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত। সমুদ্রে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে এবার ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য জলে নামল নতুন অফশোর পেট্রল ভেসেল ‘শ্রেয়স’। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে তৃতীয় এই জাহাজ জলে নামিয়ে জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করল কলকাতার গার্ডেনরিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স (জিআরএসই)।
শনিবার কলকাতায় জিআরএসই-র ডকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় নৌবাহিনীর ভাইস চিফ ভাইস অ্যাডমিরাল অজয় কোচ্ছার। জাহাজটির নির্মাণকাজ ইতিমধ্যেই প্রায় ৬৮ শতাংশ সম্পূর্ণ হয়েছে। প্রায় ৪৫ দিন অন্তর একটি করে জাহাজ জলে নামানোর ধারাবাহিকতায় সন্তোষ প্রকাশ করেন নৌবাহিনীর শীর্ষ আধিকারিক। তাঁর মতে, এই সাফল্য দেশের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ শিল্পের ক্রমবর্ধমান দক্ষতা ও উৎপাদন ক্ষমতার পরিচায়ক।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অজয় কোচ্ছার বলেন, “এই সাফল্য জিআরএসই-র কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম এবং ২৪ ঘণ্টা ধরে কাজ করার মানসিকতার প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি ভারতের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান গতি, ব্যাপ্তি ও সক্ষমতার পরিচয়।” তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে সমুদ্রে দীর্ঘসময় নজরদারি চালানো এবং নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে পরবর্তী প্রজন্মের এই অফশোর পেট্রল ভেসেলগুলি। সামুদ্রিক এলাকায় নজরদারি চালানো, জলদস্যু দমন, বিপর্যয়ের সময় উদ্ধার ও ত্রাণকাজ এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনায় ব্যবহার করা হবে এই ধরনের জাহাজ। এর ফলে ভারতের সামুদ্রিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকাগুলিতে নৌবাহিনীর উপস্থিতি আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি নয়, দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রেও আত্মনির্ভরতার উপর জোর দিচ্ছে ভারত। দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে আরও শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে।
নৌবাহিনীর ভাইস চিফের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে ৪২টিরও বেশি জাহাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। পাশাপাশি ১০টি বড় প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৮টি জাহাজ ও সাবমেরিন এবং ১২৭টি ফাস্ট ইন্টারসেপ্টর ক্রাফট নির্মাণের কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে এগোচ্ছে।
এই বিপুল কর্মযজ্ঞের লক্ষ্য দেশীয় জাহাজ নির্মাণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বিদেশি নির্ভরতা কমানো। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় সক্ষম শিল্পব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোকে মজবুত করতেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, ‘শ্রেয়স’-এর জলে নামা ভারতীয় নৌবাহিনীর সামুদ্রিক নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আন্তর্জাতিক জলপথে অস্থিরতা বাড়ার আবহে সমুদ্রে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই ধরনের জাহাজের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal