প্রসেনজিৎ ধর, কলকাতা :-দুর্গাপুজো শেষ হওয়ার পর সোমবার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হল রাজ্য সরকারের বিজয়া সম্মিলনী। অনুষ্ঠানে পুজো উদ্যোক্তা ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। দেবী সম্মান প্রদান অনুষ্ঠানে পুজোর আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসন, পুলিশ এবং বিভিন্ন সরকারি দফতরের কর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। তবে উৎসবের আনন্দের বদলে এদিনের অনুষ্ঠানে বারবার উঠে আসে চোরবাগান মণ্ডপে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রসঙ্গ।মুখ্যমন্ত্রী জানান, বিজয়া সম্মিলনীর মঞ্চে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরার পরিকল্পনা ছিল সরকারের। কোচবিহারের ভাওয়াইয়া, ঝাড়গ্রামের ঝুমুর, পুরুলিয়ার ছৌনাচ, কার্শিয়ংয়ের লোকসঙ্গীত, নবদ্বীপের মৃদঙ্গ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার বনবিবির পালার মতো নানা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একই মঞ্চে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার জেরে সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন করতে হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, সরকারের সাফল্য বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও মানুষের দুর্ভোগ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত রাখা হয়। একই সঙ্গে দুর্ঘটনায় আহত ২৫ জনের পরিবারের হাতে আর্থিক সাহায্য তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। আহতদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে বলে দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, কোনও ধরনের অহঙ্কারকে গুরুত্ব না দিয়ে আহতদের বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে |চোরবাগানকাণ্ডের তদন্ত প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনাটিকে কোনওভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এটি মানুষের ভুল বা ‘হিউম্যান এরর’-এর ঘটনা। নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত কমিটির হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তদন্তে যে সুপারিশ উঠে আসবে, তা প্রকাশ্যে আনার পাশাপাশি পুজো কমিটিগুলির কাছেও পৌঁছে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন শুভেন্দু। ২০২৭ সালের দুর্গাপুজোয় যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলে জানান তিনি। চোরবাগানের দুর্ঘটনা বাদ দিলে রাজ্যের প্রায় ৬৬ হাজার দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ফালাকাটা, ফরাক্কা, গার্ডেনরিচ, খাগড়াবনি, ক্যানিং, শিরাকোল ও ভাঙড়ের মতো এলাকায় অতীতে বিসর্জন কিংবা মাইক বাজানো নিয়ে যে ধরনের বিধিনিষেধ দেখা যেত, এ বার পরিস্থিতি তার থেকে আলাদা ছিল। আগের প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার—তবে ধর্ম রক্ষা করার দায়িত্ব তার তার।” তাঁর দাবি, এটাই পরিবর্তিত পশ্চিমবঙ্গের পরিচয়।, জগদ্ধাত্রী পুজো এবং বাঁশবেড়িয়া ও বেলডাঙার মতো এলাকার ঐতিহ্যবাহী কার্তিক পুজো। নৈহাটি, বারাসত, চন্দননগর ও কাটোয়ার মতো জায়গায় উৎসবের ভিড় সামলানোও প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। ছটপুজোয় বিপুল সংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগমের কথা মাথায় রেখে আগামী ২৮ অক্টোবর সরকারি দফতর খোলার পরই প্রস্তুতি বৈঠক শুরু হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি উৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার আশ্বাসও দেন তিনি।
এদিন গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি নিয়েও বক্তব্য রাখেন মুখ্যমন্ত্রী। মেলাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে প্রশাসন কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি। ২০১৭ সালে জেটি ভেঙে ১৭ জন পুণ্যার্থীর মৃত্যুর ঘটনার কথা উল্লেখ করে এ বার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনায় কোনও খামতি রাখতে চান না বলে জানান শুভেন্দু।এছাড়াও আগামী কয়েক মাসে রাজ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। ১৭ থেকে ২৩ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব, ৮ ও ৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে প্রবাসী ভারতীয় সম্মেলন এবং ২৭ জানুয়ারি থেকে চার দিনব্যাপী ওয়ার্ল্ড এনার্জি উইকের মতো কর্মসূচির প্রস্তুতির কথাও জানান তিনি। দেশ-বিদেশের অতিথিদের সামনে বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিকাঠামোকে তুলে ধরাই সরকারের লক্ষ্য বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal