প্রসেনজিৎ ধর, কলকাতা :-চোখে জল, বুকে চাপা কষ্ট আর একরাশ শূন্যতা নিয়ে শনিবার বিকেলে নিমতলা ঘাটে নিরঞ্জন হল চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর প্রতিমা। তবে গোটা প্রক্রিয়ায় পুজো কমিটির কোনও সদস্যকে দেখা যায়নি। পুলিশের উদ্যোগেই মণ্ডপ থেকে প্রতিমা বার করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ভয়াবহ স্মৃতি এখনও তাড়া করে বেড়াচ্ছে এলাকাবাসীকে। তাই বিসর্জনের মুহূর্তেও উৎসবের আমেজের বদলে ছিল শোক আর বিষণ্ণতা। প্রতিমা বার করে আনার জন্য শুক্রবারই মণ্ডপের গেটের কিছুটা অংশ কেটে ফেলা হয়েছিল। শনিবার দুপুরে প্রতিমা নামিয়ে আনার তোড়জোড় শুরু হয়। নিরঞ্জন পর্ব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে এলাকায় মোতায়েন করা হয় পুলিশবাহিনী। গেটের কাটা অংশ দিয়ে প্রতিমা বার করে আনার আগে সেখানে মালা পরিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। ৩৬ জন মিলে প্রতিমাকে রাস্তা দিয়ে বাইরে নিয়ে আসেন। সেই সময় এলাকার বহু মহিলা রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিমাকে প্রণাম করে বিদায় জানান।কিন্তু মণ্ডপ থেকে প্রতিমাকে কী ভাবে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হবে, তা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। উপস্থিত ছিলেন না পুজো উদ্যোক্তা বা কমিটির কোনও সদস্য। শেষ পর্যন্ত পুলিশই গোটা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়। সিমলা ব্যায়াম সমিতির এক পুজো কর্মকর্তাকেও নিয়ে আসা হয়। এরপর শুরু হয় প্রতিমাকে ঘাটে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া।
প্রথমে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি লরি আনা হয়। দড়ি ও বাঁশের সাহায্যে প্রতিমাকে লরিতে তোলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে পুলিশের উদ্যোগে একটি লোহার কার্টের ব্যবস্থা করা হয়। তার উপর প্রতিমাকে তুলে পুলিশি পাহারায় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে নিমতলা ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেওয়া হয়।প্রতিমাকে বিদায় জানানোর সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি এলাকার বহু বাসিন্দা। পাড়ার এক প্রবীণ মহিলা হাতজোড় করে প্রতিমাকে প্রণাম করেন। তাঁর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল জল। তিনি বলেন, এ বছর যা ঘটে গেল, এমন ঘটনা যেন আর কখনও না ঘটে। কত মানুষের মৃত্যু চোখের সামনে দেখতে হয়েছে, কত পরিবারের আলো নিভে গিয়েছে—সেই যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর প্রার্থনা, জীবনে যেন আর এমন দুর্দিন দেখতে না হয়।
এলাকার অন্য বাসিন্দাদের মনেও এখনও তাজা সেই ভয়াবহ সন্ধ্যার স্মৃতি। এক স্থানীয় বাসিন্দার কথায়, দুর্ঘটনার দিনের চিৎকার আর মৃত্যুর দৃশ্য এখনও চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ঈশ্বরের কাছে তাঁদের একটাই প্রার্থনা, এমন দিন যেন আর কখনও ফিরে না আসে।
পুজো কমিটির সদস্যদের অনুপস্থিতিতেও এলাকার কয়েক জন বাসিন্দা প্রতিমা নিরঞ্জনের সময়ে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েক জন হাতে মোমবাতি নিয়ে প্রতিমার আগে আগে হাঁটেন। একটি ট্রাকের সামনের কালো ব্যানারে মৃত ও আহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়। শোকের আবহেই সম্পন্ন হয় চোরবাগানের প্রতিমা নিরঞ্জন।উল্লেখ্য, গত ১৭ অক্টোবর পুজোর সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে। ভিড়ের চাপে মৃত্যু হয় ১৯ জনের। আহত হন ২৫ জন। কী ভাবে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে কলকাতা পুলিশ। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
ঘটনার তদন্তে ছ’সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করেছে কলকাতা পুলিশ। গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী কমিশনার পদমর্যাদার এক আধিকারিকের নেতৃত্বে তদন্ত চলছে। বৃহস্পতিবার সকালে সিটের সদস্যরা ফের মণ্ডপে গিয়ে গোটা এলাকা পরিদর্শন করেন। এর আগে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা এবং ঘটনার সময়ে উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার ও ক্লাব সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে দুর্ঘটনার ঘটনাক্রম পুনর্গঠনের চেষ্টা করা হয়েছে।সিটের পর ঘটনাস্থলে যায় ফরেনসিক দলও। সিটের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীও ওই দিন চোরবাগানের পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রতিমা নিরঞ্জন করা হলেও প্যান্ডেল আপাতত রেখে দেওয়া হবে। ফলে প্রতিমা বিসর্জন হলেও দুর্ঘটনার তদন্তের স্বার্থে মণ্ডপটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal