দেবরীনা মণ্ডল সাহা:- ২০২৯ সালে মুড়িগঙ্গা নদীর উপর প্রস্তাবিত সেতুর উদ্বোধন করা হবে। শনিবার কাকদ্বীপে একটি সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে এই ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে তোলার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। সুন্দরবনের সামগ্রিক উন্নয়ন, পর্যটনে জোর এবং গ্রামীণ আবাসন প্রকল্প নিয়েও একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে আগের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও উন্নয়ন নিয়ে গাফিলতির অভিযোগও। মুড়িগঙ্গার উপর সেতু নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। তৃণমূল সরকারের আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সেতু তৈরির কথা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও জমি অধিগ্রহণ এবং বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট (ডিপিআর) তৈরির মতো প্রয়োজনীয় কাজ করেনি।
কাকদ্বীপের সরকারি অনুষ্ঠান থেকে শুভেন্দু বলেন, “আগের সরকার এই সেতু তৈরির নামে মিথ্যা কথা বলেছিল। জমি অধিগ্রহণ বা ডিপিআর কিছুই করেনি। আমি কথা দিয়ে যাচ্ছি, ২০২৯ সালে সেতু উদ্বোধন করব।” তাঁর এই ঘোষণার ফলে দীর্ঘদিন ধরে সেতুর অপেক্ষায় থাকা সাগরদ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
মুড়িগঙ্গা নদী সাগরদ্বীপকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। বর্তমানে দ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম ভরসা ভেসেল পরিষেবা। কিন্তু ভাটার সময় নদীতে জলস্তর কমে গেলে ভেসেল চলাচল ব্যাহত হয়, কখনও কখনও বন্ধও রাখতে হয় পরিষেবা। ফলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের। বিশেষ করে অসুস্থ রোগী, শিশু ও মহিলাদের ভোগান্তি বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে মুড়িগঙ্গার উপর সেতু তৈরি হলে সাগরদ্বীপের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তৃণমূল সরকারের আমলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছিল, প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনের গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেতুটি এক দিকে কাকদ্বীপ, অন্য দিকে কচুবেড়িয়াকে যুক্ত করবে। দুই পাশে ফুটপাথ তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।সেই সময় পূর্ত দপ্তর সূত্রে সেতুর নকশা তৈরি, সমীক্ষা, টেন্ডার ও ডিপিআর-সংক্রান্ত কাজের অগ্রগতির কথা জানানো হয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, রাজ্য সরকারই সেতুর ডিপিআর তৈরি করছে। তবে আগের সরকারের সেই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু। ফলে প্রকল্পটির বর্তমান প্রস্তুতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, “এই জেলাকে বদলে দেব। সুন্দরবনকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ২ বছর সময় লাগলেও কাকদ্বীপকে আলাদা জেলা করা হবে।” সুন্দরবনের উন্নয়ন নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন করতে চায় তাঁর সরকার। আগের অর্থবর্ষে বরাদ্দ অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয়নি এবং বরাদ্দের বড় অংশে দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আগামী কয়েক মাসে উন্নয়নের কাজ আরও গতি পাবে বলে আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি পর্যটন ক্ষেত্রের প্রসারেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।এর আগে প্রশাসনিক বৈঠকে গঙ্গাসাগর মেলা এবং সুন্দরবনের নদীবাঁধের পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। নদীবাঁধের নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটনের উন্নয়ন সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।এ দিনের অনুষ্ঠান থেকে নাবালিকা বিবাহ রোধে সকলকে সতর্ক থাকার বার্তাও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে জেহাদি ও জঙ্গি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সতর্ক নজরদারি রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
গ্রামীণ আবাসন প্রকল্প নিয়েও বড় ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় নতুন করে ৪ লক্ষ ৮১ হাজার ২৪২টি বাড়ি তৈরি করা হবে। কোনও কাঁচাবাড়ি যাতে না থাকে, সেই লক্ষ্যেই কাজ করা হবে বলে জানান তিনি। আগের সরকারের বিরুদ্ধে বাড়ি তৈরির প্রকল্পে অনিয়ম ও অর্থ তছরুপের অভিযোগও তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, গোয়ালঘরকে বাড়ি দেখিয়েও অনেকে আবাসন প্রকল্পের সুবিধা নিয়েছেন।
এছাড়া গঙ্গাসাগর মেলার উদ্বোধন করতে আগামী ১০ জানুয়ারি ফের জেলায় আসবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সব মিলিয়ে মুড়িগঙ্গা সেতু নির্মাণ, কাকদ্বীপকে পৃথক জেলা করা এবং সুন্দরবনের উন্নয়ন—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার জন্য একাধিক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরলেন তিনি। তবে ঘোষিত প্রকল্পগুলি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটা বাস্তবায়িত হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal