প্রসেনজিৎ ধর, কলকাতা :-খাস কলকাতায় তিন জনকে নগ্ন করে রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছিল বেহালার সরশুনায়। এবার সেই ঘটনায় ধৃত তিন অভিযুক্তকে খালি গায়ে ও খালি পায়ে এলাকায় হাঁটাল পুলিশ। মঙ্গলবার সকালে এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যই অভিযুক্তদের এ ভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তবে পুলিশের এই পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। অভিযোগ, নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্তদের এ ভাবে ঘোরানো কি আইনসম্মত? নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কোনও উদ্দেশ্য?ঘটনার সূত্রপাত একটি কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ, ১৩ বছরের এক কিশোরীকে চুম্বন করেছিলেন ১৯ বছরের এক তরুণ। এই অভিযোগের জেরে তরুণ, তাঁর বাবা এবং আরও এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্য রাস্তায় নগ্ন করে হাঁটতে বাধ্য করা হয়। প্রায় ৫০ মিটার রাস্তা তাঁদের এ ভাবে হাঁটানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি সামনে আসতেই এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়।তরুণের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার সরশুনা থানায় মামলা দায়ের হয়। এরপরই তদন্তে নেমে পুলিশ কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার, মামা রাহুল বর্মন, মা রিঙ্কু সরকার এবং প্রতিবেশী শঙ্কর সাউকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অন্যদেরও খোঁজ চলছে বলে জানা গিয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে সরশুনা এলাকাতেই ধৃতদের মধ্যে তিন জনকে খালি গায়ে ও খালি পায়ে হাঁটাতে দেখা যায়। তাঁদের কোমরে দড়ি বাঁধা ছিল। পরনে ছিল হাফ প্যান্ট বা বারমুডা। সঙ্গে ছিলেন পুলিশকর্মীরা। অভিযুক্তদের দেখতে রাস্তায় ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দারা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই তিন জনের মধ্যে রয়েছেন কিশোরীর বাবা, মামা এবং এক প্রতিবেশী। ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যই তাঁদের ওই ভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বলে দাবি পুলিশের।
তবে পুলিশের এই পদক্ষেপ নিয়ে সরব হয়েছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আহমেদের বক্তব্য, সরশুনার ঘটনায় প্রথম থেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তরুণ ও তাঁর বাবার সঙ্গে যখন এই ঘটনা ঘটছিল, তখন সময়মতো পুলিশ পৌঁছলে পরিস্থিতি এড়ানো যেত। অথচ পরে অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় ঘোরানো হয়েছে। পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব পুলিশের। আইন মেনে পদক্ষেপ করার পরিবর্তে পুলিশ নিজেরাই যদি এমন কাজ করে, তা হলে তা উদ্বেগজনক।
আলতাফ আহমেদের আরও বক্তব্য, অভিযুক্তদের এ ভাবে ঘোরানোর অনুমতি পুলিশের কর্মবিধি বা আইনে কোথায় রয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে অপরাধ কমানো যায় না। বরং পুলিশের দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়।
এই ঘটনায় পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ও। তাঁর মতে, একদিকে তিন জনকে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগ, অন্যদিকে ধৃতদের খালি গায়ে ও খালি পায়ে ঘোরানো— দু’টি ঘটনাই অত্যন্ত নিন্দনীয়। গোটা ঘটনাকে সভ্যতার কলঙ্ক বলে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, অভিযুক্তদের এ ভাবে হাঁটালেই কি অপরাধের শাস্তি হয়ে যায়?
রাজ্যে এই ধরনের ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের কোমরে দড়ি বেঁধে এবং খালি পায়ে এলাকায় ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছে পুলিশের বিরুদ্ধে। সেই সময়ও পুলিশের তরফে ঘটনার পুনর্নির্মাণের যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তবে তদন্তের প্রয়োজনে অভিযুক্তকে নিয়ে যাওয়া এবং প্রকাশ্যে তাঁর মর্যাদাহানি করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
উল্লেখ্য, জুন মাসে একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে কলকাতা হাই কোর্টও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছিল। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত এবং বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছিল, পুলিশ আইন মেনে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে পারে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তিও হতে পারে। কিন্তু গ্রেফতারের নামে ইচ্ছাকৃত ভাবে কারও সম্মানহানি করা যায় না। ওই মামলায় রাজ্যের কাছ থেকে রিপোর্টও তলব করেছিল আদালত।
সরশুনার ঘটনা ঘিরে তাই এখন একাধিক প্রশ্ন উঠছে। একদিকে প্রকাশ্যে তিন জনকে নগ্ন করে হাঁটানোর অভিযোগ, অন্যদিকে সেই ঘটনায় ধৃতদের অর্ধনগ্ন অবস্থায় পুলিশের ঘোরানো— দুই ক্ষেত্রেই আইন ও মানবাধিকারের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ঘটনার তদন্তের পাশাপাশি পুলিশের এই পদক্ষেপ কতটা বিধিসম্মত, তা নিয়েও বিতর্ক ক্রমশ বাড়ছে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal