Breaking News

বাংলার ভবিষ্যতের রূপরেখা প্রথম বাজেটে! ডিএ, চাকরি, ভাতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও পরিকাঠামোতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা

দেবরীনা মণ্ডল সাহা, কলকাতা :- পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে একাধিক বড় ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। সোমবার প্রায় দেড় ঘণ্টার বাজেট ভাষণে সরকারি কর্মচারী, বেকার যুবক-যুবতী, মহিলা, ছাত্রছাত্রী, প্রবীণ নাগরিক, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য একাধিক প্রকল্প ও আর্থিক সুবিধার কথা ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, পর্যটন ও প্রশাসনিক পরিকাঠামোর উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

*সরকারি কর্মীদের জন্য বড় উপহার, ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি*
রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তির ঘোষণা করা হয়েছে বাজেটে। বর্তমানে ১৮ শতাংশ হারে ডিএ পাওয়া কর্মীরা আগামী ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩৮ শতাংশ হারে মহার্ঘ ভাতা পাবেন। অর্থাৎ এক ধাক্কায় ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। দীর্ঘদিন ধরে ডিএ নিয়ে চলা বিতর্কের আবহে এই ঘোষণাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

*বদলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক মানচিত্র*
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিষেবা পৌঁছে দিতে রাজ্যে ৫টি নতুন জেলা গঠনের ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে কলকাতা, বসিরহাট, সুন্দরবন, জঙ্গিপুর ও আরামবাগকে। পাশাপাশি ১০টি নতুন পুরসভা গঠন, গোপীবল্লভপুরে নতুন মহকুমা, কাঁথিতে নতুন পুলিশ জেলা এবং চারটি নতুন বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

*সরকারি চাকরিতে ১ লক্ষ নিয়োগ*
বেকার যুবকদের জন্য অন্যতম বড় ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। বিভিন্ন সরকারি দফতরে মোট ১ লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ করা হবে। এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এছাড়া ২০ হাজার পুলিশ কর্মী, ৫০ হাজার শিক্ষক, অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মী এবং ১ হাজার ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রন্টিয়ার ও রাইফেলস কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি নিয়োগে স্বচ্ছতা বজায় রাখার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে।

*বয়সসীমায় ছাড় অব্যাহত*
সরকারি চাকরির আবেদনকারীদের জন্য বয়সের ঊর্ধ্বসীমায় ছাড়ের সুবিধা আরও দু’বছর চালু থাকবে। গ্রুপ-এ পদে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়স ৪১ বছর, গ্রুপ-বি পদে ৪৪ বছর এবং গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি পদে ৪৫ বছর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।

*‘ভরসা’ প্রকল্পে বেকারদের মাসিক ভাতা*
শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য চালু করা হয়েছে ‘ভরসা কর্মসূচি’। এই প্রকল্পে ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি যোগ্য শিক্ষিত ও কর্মহীন যুবক-যুবতীরা আর্থিক সহায়তা পাবেন। স্নাতকদের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা এবং অন্যান্য যোগ্য আবেদনকারীদের জন্য মাসে ২ হাজার টাকা দেওয়া হবে। আগামী অক্টোবর মাস থেকে এই প্রকল্প কার্যকর হবে। যেসব পরিবারের বার্ষিক আয় এক লক্ষ টাকার কম এবং যারা অন্য কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন না, তারাই এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন।

*সিভিক, গ্রিন পুলিশ, আশা কর্মী-সহ একাধিক ক্ষেত্রে ভাতা বৃদ্ধি*
সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ, গ্রিন পুলিশ, এনভিএফ কর্মী, প্রাণীবন্ধু, প্রাণিমিত্র এবং হোমগার্ডদের পারিশ্রমিক মাসিক ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আশাকর্মীদের সম্মানিক ৫ হাজার টাকা বাড়ানোর ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি মিড-ডে মিল কর্মীদের ভাতাও ১ হাজার টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। আগামী আগস্ট মাস থেকেই এই বর্ধিত ভাতা কার্যকর হবে।

*মহিলাদের জন্য একগুচ্ছ প্রকল্প*
মহিলাদের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য একাধিক ঘোষণা করা হয়েছে। অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বিনামূল্যে বাস পরিষেবার জন্য ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের পাশাপাশি চালু করা হচ্ছে ‘পিঙ্ক কার্ড’। গর্ভবতী মায়েদের ২১ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা ও ৬টি পুষ্টি কিট দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া উচ্চশিক্ষায় অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।

*শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় বরাদ্দ*
আদর্শ বিদ্যালয় নির্মাণে ২১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। শিলিগুড়িতে আইআইটি ও আইআইএম স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃত কলেজ ও সংস্কৃত ভাষার প্রসারে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ঝাড়গ্রাম ও বাঁকুড়ায় দুটি কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি জেলায় বিনামূল্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার কোচিং সেন্টার চালুর পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারি ও সরকার পোষিত কলেজের পড়ুয়াদের জন্য এককালীন ৩০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

*স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় বড় জোর*
উত্তরবঙ্গে একটি AIIMS এবং একটি ক্যান্সার হাসপাতাল তৈরির ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া রাজ্যে ৫টি নতুন মেডিক্যাল হাব গড়ে তোলা হবে। সুন্দরবনে মোটরবোট অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালু করা হবে। ভেলোর ও মুম্বইয়ে চিকিৎসার জন্য যাওয়া রোগীদের পরিবারের থাকার ব্যবস্থাও করবে রাজ্য সরকার।

*শিল্প ও কর্মসংস্থানে বড় বিনিয়োগ*
উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত গাড়ির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিলিগুড়িতে আইটি পার্ক ও ইন্টিগ্রেটেড লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা হবে। দুর্গাপুরে সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট এবং দক্ষিণ দিনাজপুরে টেক্সটাইল হাব তৈরির ঘোষণাও করা হয়েছে। শিল্পে নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার।

*ধর্মীয় পর্যটন ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব*
রাজ্যে শক্তিপীঠ সার্কিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কালীঘাট, তারাপীঠ, ফুল্লরা ও বক্রেশ্বরকে নিয়ে এই পর্যটন সার্কিট তৈরি হবে। পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য হেরিটেজ কমিশন গঠন করা হবে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি সংরক্ষণে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণাও করা হয়েছে।

সরকারি কর্মীদের ডিএ বৃদ্ধি থেকে শুরু করে এক লক্ষ চাকরির ঘোষণা, বেকারদের জন্য মাসিক ভাতা, মহিলাদের আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বড় বিনিয়োগ, শিল্পায়নের নতুন রূপরেখা এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মতো একাধিক সিদ্ধান্তে এবারের বাজেটকে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানমুখী বাজেট হিসেবেই তুলে ধরেছে রাজ্য সরকার। আগামী দিনে এই ঘোষণাগুলির বাস্তবায়ন কতটা দ্রুত হয়, সেদিকেই এখন নজর রাজ্যবাসীর।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *