প্রসেনজিৎ ধর, কলকাতা :-দুপুর গড়িয়ে তখন প্রায় ১২টা ৫ থেকে ৭ মিনিট। আচমকাই বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোড। মুহূর্তের মধ্যেই ধুলোর ঘন মেঘে ঢেকে যায় গোটা এলাকা। কলকাতা বন্দরের জমিতে নির্মীয়মাণ একটি বিশাল গুদামের লোহার কাঠামো ও ছাদ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। চোখের পলকে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন বহু শ্রমিক।কলকাতার তারাতলার ব্রেসব্রিজ এলাকায় ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরপরই শুরু হয় বৃহৎ উদ্ধার অভিযান। সেনাবাহিনী, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), অসামরিক প্রতিরক্ষা, দমকল এবং কলকাতা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে। শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৬ জন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের গ্রিন করিডোরের মাধ্যমে দ্রুত এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় গুদামের ভিতরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। ফলে এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে কতজন আটকে রয়েছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ক্রেন, গ্যাসকাটার এবং বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে লোহার বিশাল কাঠামো সরিয়ে আটকে পড়াদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।প্রাথমিক তদন্তে জানা যাচ্ছে, কয়েক হাজার বর্গফুট এলাকা জুড়ে থাকা জমিটির মালিক কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ। সেই জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজে নিয়ে সেখানে একটি বৃহৎ চা-গুদাম তৈরির কাজ চলছিল। প্রায় দেড় বছর ধরে নির্মাণাধীন পাঁচতলা কাঠামোটির লোহার ফ্রেম ও ছাদের অংশ বুধবার আচমকাই ভেঙে পড়ে।উদ্ধারকাজ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজ্য প্রশাসনের তরফে ফোর্ট উইলিয়ামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার, চিকিৎসক ও উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পাশাপাশি এনডিআরএফ, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর কর্তৃপক্ষের ক্রেন, দমকল, অ্যাম্বুল্যান্স ও চিকিৎসক দলও উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু না হলে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারত। আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে সবরকম ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।স্থানীয়দের দাবি, জমিটি ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামে একটি সংস্থা বন্দরের কাছ থেকে লিজ নিয়েছিল। সংস্থার মালিক শম্ভুনাথ বেহরা। মূলত চা-পাতা সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত এই সংস্থার জন্যই নতুন গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছিল। বন্দর সূত্রে খবর, ২০২৪ সালের ১ অগস্ট থেকে ৩০ বছরের জন্য জমিটির লিজ দেওয়া হয়েছিল।
এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, আগে সেখানে একটি পুরনো গুদাম ছিল। সেটি ভেঙে প্রায় এক বছর আগে নতুন করে বিশাল কাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হয়। স্থানীয়দের আরও দাবি, দুর্ঘটনার দিন সকাল থেকেই নির্মীয়মাণ ভবনের মূল লোহার কাঠামো অস্বাভাবিকভাবে দুলছিল। বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।সূত্রের খবর, কাঠামোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা পরীক্ষা করতেই কয়েকজন শ্রমিক দুপুরে ওই অংশে যান। কিন্তু পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই বিশাল লোহার বিম ও ছাদের অংশ বিকট শব্দে ভেঙে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বহু শ্রমিক টন টন ওজনের লোহার কাঠামোর নিচে চাপা পড়েন।
এদিকে, দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে পুলিশ। ‘বেহরা ব্রাদার্স’-এর দেওয়া নির্মাণ সংক্রান্ত নথি, ঠিকাদার সংস্থার তথ্য, গুদামের নকশা এবং নির্মাণসামগ্রীর গুণমান সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পরই ধসের প্রকৃত কারণ এবং কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হবে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal