নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা :- ১৯ ও ২০ অগস্ট যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষ ও উত্তেজনার পর ‘বন্দে মাতরম’ এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রতিষ্ঠার যে বার্তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দিয়েছিলেন, শুক্রবার রাখিবন্ধনের দিন তারই প্রতিফলন দেখা গেল যাদবপুরে। প্রবল বৃষ্টি উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে যাদবপুর থানা পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে জমায়েত করেন হাজার হাজার মানুষ। হাতে ছিল তেরঙ্গা। গর্জে ওঠে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি।
এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘১০ হাজার কণ্ঠে বন্দে মাতরম’। অনুষ্ঠান ঘিরে নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২, ৩ ও ৪ নম্বর গেট বন্ধ রাখা হয়। শুধুমাত্র ১ নম্বর গেট দিয়ে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়।এইট-বি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ র্যাম্প তৈরি করা হয়েছিল। কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুপুর ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজা সুবোধচন্দ্র মল্লিক রোডে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি গেটও বন্ধ রাখা হয়েছিল।
অনুষ্ঠানের মঞ্চে উঠে বাম ও তৃণমূল জমানার তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, পূর্বতন সরকারগুলির পথে হাঁটবে না তাঁর সরকার। যাদবপুরের ছাত্র রাজনীতি নিয়েও কড়া ভাষায় বার্তা দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, এবার যাদবপুরে ‘বেয়াদব’ এবং ‘রাষ্ট্রবাদী’—এই দুইয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে।
শুভেন্দুর অভিযোগ, যাদবপুরের একাংশ পড়ুয়ার বিভিন্ন কর্মসূচিতে ভারতবিরোধী স্লোগান শোনা যায়। তাঁর দাবি, জাতীয় ইস্যুতেও দেশের পক্ষে স্লোগানের পরিবর্তে ‘আজ়াদি’র কথা বলা হয়। সিঁদুর অভিযানের সময়ও ‘যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই’ স্লোগান তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাম আমলের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ঐতিহ্যের অবনতি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীদের যথাযথ মর্যাদা দেওয়া হয়নি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে বামেদের পুরনো মন্তব্যেরও উল্লেখ করেন তিনি।
যাদবপুরকে ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রের বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের কথাও তুলে ধরেন শুভেন্দু। একই সঙ্গে নকশাল আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোপাল সেনের হত্যার প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।এরপর তৃণমূল সরকারের আমলের সমালোচনা করতে গিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলে স্বপ্নদীপ কুণ্ডুর অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে আনেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হস্টেলগুলিতে ‘থ্রেট কালচার’ বা ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
নিজের পুরনো অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেন শুভেন্দু। তিনি দাবি করেন, র্যাগিংয়ের প্রতিবাদ জানাতে যাদবপুরে গেলে তাঁর গাড়িতে হামলার চেষ্টা হয়েছিল এবং তাঁকে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তৃণমূল ও বামেদের বিরুদ্ধে ‘গোপন বোঝাপড়া’র অভিযোগ তোলেন তিনি।
শুভেন্দুর আরও দাবি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ পড়ুয়াই দেশপ্রেমিক ও রাষ্ট্রবাদী। কিন্তু একটি ছোট গোষ্ঠী ভয় দেখিয়ে সাধারণ পড়ুয়াদের বিভিন্ন মিছিলে যোগ দিতে বাধ্য করছে। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের চাকরি দুর্নীতি বা নিয়োগ সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে ওই গোষ্ঠীর মুখে কোনও স্লোগান শোনা যায় না, বরং ‘আজ়াদি’ স্লোগানই বেশি শোনা যায়।সব মিলিয়ে রাখিবন্ধনের দিনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ‘বন্দে মাতরম’ কর্মসূচির মঞ্চ থেকে ছাত্র রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে একাধিক কড়া বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal