Breaking News

শয্যাশায়ী স্ত্রীকে বাড়ি নিতে অস্বীকার স্বামীর, সাড়ে চার বছর হাসপাতালেই কাটালেন পুনম! হাইকোর্টের নির্দেশে অবশেষে ঘরে ফেরা

দেবরীনা মণ্ডল সাহা, কলকাতা :-শয্যাশায়ী স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে দেখভালের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছিলেন স্বামী। সেই কারণে টানা সাড়ে চার বছর হাসপাতালের বেডই হয়ে উঠেছিল আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাসিন্দা পুনম গুপ্তের স্থায়ী ঠিকানা। অবশেষে কলকাতা হাই কোর্টের হস্তক্ষেপে বাড়ি ফিরলেন তিনি। আদালতের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, বৈধ স্ত্রীর দায়িত্ব কোনওভাবেই এড়াতে পারেন না স্বামী। পুনম গুপ্ত ও তাঁর স্বামী জয়প্রকাশ গুপ্ত কলকাতার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে স্বামীর সঙ্গে স্কুটিতে যাওয়ার সময় আমহার্স্ট স্ট্রিট এলাকায় দুর্ঘটনার কবলে পড়েন পুনম। স্কুটি থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি। প্রথমে ভর্তি করা হয় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। পরে বাইপাস লাগোয়া একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
দীর্ঘ চিকিৎসার পরেও স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি পুনম। কথা বলা ও চলাফেরার ক্ষমতা হারান। যদিও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তিনি ইশারায় সাড়া দেন এবং নিজে খাবারও খেতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, বাড়িতে রেখেও তাঁর চিকিৎসা চালানো সম্ভব ছিল।কিন্তু অভিযোগ, পুনমকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাননি তাঁর স্বামী। এমনকি একসময় হাসপাতালের বিল মেটানোও বন্ধ করে দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে বিমা সংস্থা দেয় ৫ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা এবং পরিবারের পক্ষ থেকে জমা পড়ে মাত্র ১৫ হাজার টাকা।
এই পরিস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জয়প্রকাশের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। পরে ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিকাল এসট্যাবলিশমেন্ট রেগুলেটরি কমিশনের দ্বারস্থ হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিশনের নোটিসেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। শেষমেশ কমিশনের পরামর্শে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়।
আদালতে জয়প্রকাশ দাবি করেন, তাঁর পক্ষে ‘জীবন্মৃত’ স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে দেখাশোনা করা সম্ভব নয়। তিনি পুনমকে কোনও সরকারি হাসপাতাল বা হোমে পাঠানোর আবেদন জানান। এরপর বিচারপতি কৃষ্ণা রাও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন।বোর্ডের রিপোর্টে জানানো হয়, পুনমকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা চালানো সম্ভব। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই আদালত তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, স্ত্রী অসুস্থ হলেই তাঁকে পরিত্যাগ করা যায়— এমন বার্তা সমাজে যেতে পারে না। পুনমকে হোমে পাঠানো হলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে বলেও মন্তব্য করে আদালত।
আদালত আরও জানায়, বিশেষ শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধকতার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই হোমে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুধুমাত্র পরিবারের দায়িত্ব এড়াতে কাউকে সেখানে পাঠানো যায় না। পুনমের ১৭ বছরের সন্তান রয়েছে বলেও আদালত উল্লেখ করে। মাকে অন্যত্র পাঠানো হলে সেই সন্তান মাতৃসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হবে বলেও পর্যবেক্ষণ আদালতের।
শেষ পর্যন্ত হাই কোর্টের নির্দেশে বৃহস্পতিবার বিকেলে সাড়ে চার বছর পর বাড়ি ফেরেন পুনম গুপ্ত। আদালতের নির্দেশেই হাসপাতালের বিপুল অঙ্কের বিলও মকুব করা হয়েছে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *