Breaking News

ওবিসি সংরক্ষণে নতুন মোড়! বাম-তৃণমূল আমলের আইন সংশোধনে জোড়া বিল পাশ, ভোটাভুটিতে স্পষ্ট ব্যবধানে জিতল সরকার

দেবরীনা মণ্ডল সাহা,কলকাতা :- জোড়া ওবিসি আইন সংশোধনী বিল পেশ হল বিধানসভায়। বিল দু’টির নাম – ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান SC অ্যান্ড ST) রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ বিল দুটি পেশ করেন রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণমন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। প্রথমে ধ্বনিভোটে বিল পাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির দাবিতে ভোটাভুটি (ডিভিশন) হয়। স্পিকার রথীন্দ্র বসু সেই আবেদন মঞ্জুর করেন। শেষ পর্যন্ত বিলের পক্ষে ১৮৬টি ভোট পড়ে, বিপক্ষে ভোট দেন ১৭ জন বিধায়ক এবং ছ’জন ভোটদানে বিরত থাকেন।
ভোটাভুটির আগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের একাংশ ওয়াকআউট করলেও কয়েকজন বিধায়ক সময়মতো কক্ষ ছাড়তে পারেননি। পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে তাঁরা বেরিয়ে যান। এ নিয়ে স্পিকার তাঁদের ভর্ৎসনাও করেন। তবে বাইরন বিশ্বাস, মোশারফ হোসেন, কাজল শেখ ও তৌফিকুর রহমান-সহ ছয় বিধায়ক অধিবেশন কক্ষে থেকে যান। পরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাঁরা নিজেদের আসনে বসেন। বিল পাশের পর তাঁরাও ফের অধিবেশনকক্ষে ফিরে আসেন।
বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে উঠে বিজেপি বিধায়ক অরিজিৎ বক্সী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে ওবিসি তালিকা তৈরি করেছিল। অন্যদিকে, বিলের বিরোধিতা করেন জয়নগরের তৃণমূল বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস এবং আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি।নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, ওবিসি ক্যাটেগরি ‘এ’-এর আওতায় থাকা ৬৫টি জনগোষ্ঠীর তালিকা বহাল থাকলেও ক্যাটেগরি ‘বি’-তে অন্তর্ভুক্ত ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা সংবলিত ‘সিডিউল ওয়ান’ বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে কোনও গোষ্ঠীকে অনগ্রসর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানানোর সুযোগও রাখা হয়েছে। বিজেপির দাবি, পূর্ববর্তী সরকার ধর্ম ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কথা মাথায় রেখে ওবিসি তালিকায় একাধিক সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সেই তালিকার আইনি স্বীকৃতিতে পরিবর্তন আনা হল।
উল্লেখ্য, রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বামফ্রন্ট আমলে পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ চালু হয়। তখন অনগ্রসরতার মাত্রা অনুযায়ী ক্যাটেগরি ‘এ’ ও ‘বি’— এই দুই ভাগে যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ৭ শতাংশ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে ২০১২ সালে তৃণমূল সরকার আইনে সংশোধন এনে ক্যাটেগরি ‘এ’-তে ৬৫টি এবং ক্যাটেগরি ‘বি’-তে ৭৮টি জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে। সেই তালিকায় তফশিলি জাতি থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদেরও রাখা হয়েছিল।বিল পেশের সময় মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ বলেন, এই সংশোধনী কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আনা হয়নি। তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী সরকার ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে কিছু সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। বর্তমান সরকার আদালতের নির্দেশ মেনেই সেই তালিকার পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
অন্যদিকে, বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংশোধনীর কোনও বৈজ্ঞানিক বা আর্থ-সামাজিক ভিত্তি নেই। নওশাদ সিদ্দিকির মতে, সংরক্ষণের ভিত্তি হওয়া উচিত শুধুমাত্র আর্থ-সামাজিক অনগ্রসরতা, ধর্ম বা রাজনৈতিক বিবেচনা নয়। তৃণমূলের বাবর আলি, মোস্তাফিজুর রহমান ও বিশ্বনাথ দাস-সহ একাধিক বিরোধী বিধায়কও বিলটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তাঁদের অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আরও পিছিয়ে দিতেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে।দুই সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার পর ওবিসি সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক বিতর্ক যে আরও তীব্র হবে, তা স্পষ্ট।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *