দেবরীনা মণ্ডল সাহা, কলকাতা :-পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের বাজেট আলোচনা ঘিরে শুক্রবার বিধানসভায় দেখা গেল বিরল রাজনৈতিক মুহূর্ত। বিজেপির নবনিযুক্ত পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কাজের প্রকাশ্য প্রশংসা করলেন প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। সদ্য দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্নিমিত্রা যেভাবে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে কাজের তদারকি করছেন, তা স্বীকার করে নিয়ে ফিরহাদ বলেন, মাত্র আড়াই মাসের মধ্যেই তিনি যে গতিতে কাজ করছেন, সেই পরিশ্রমের প্রশংসা প্রাপ্য।বাজেট আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফিরহাদ হাকিম বলেন, “মাত্র আড়াই মাস সময় পেয়েছেন। এর মধ্যেই যেভাবে সকাল-সন্ধ্যা বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে কাজ করছেন, আমি হয়তো সেটা করতে পারিনি। এটা আমি স্বীকার করছি।” তাঁর এই মন্তব্যে বিধানসভায় মুহূর্তের জন্য অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হয়।
ঠিক সেই সময়ই শাসকদলের বেঞ্চ থেকে কটাক্ষ ভেসে আসে। তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী পূর্ণিমা চক্রবর্তীর মন্তব্য শুনে রসিকতার সুরে ফিরহাদ বলেন, “আমি আপনাদের সমর্থন করে বলবার চেষ্টা করছি, আর আপনারাই আমাকে জোর করে বিরোধী বানানোর চেষ্টা করছেন!” তাঁর এই মন্তব্যে হাসির রোল পড়ে বিধানসভায়।রাজনৈতিক পালাবদলের প্রসঙ্গ টেনে ফিরহাদ বলেন, গণতন্ত্রে ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একসময় বামফ্রন্ট কংগ্রেসের সমালোচনা করেছে, পরে তৃণমূল বামেদের কাজের সমালোচনা করেছে। ভবিষ্যতে বর্তমান সরকারকেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, “আপনারা ৫০ বছর নয়, ১০০ বা ৫০০ বছরও ক্ষমতায় থাকতে পারেন। কিন্তু একদিন তো ইতিহাসের নিয়মে জায়গা ছাড়তেই হবে। তখন আপনাদের কাজ নিয়েও বিচার হবে। শুভেন্দু অধিকারী বা অগ্নিমিত্রা পালের নেতৃত্বে যদি আমার শহর আরও উন্নত হয়, তাহলে একজন নাগরিক হিসেবে আমি গর্বিত হব।”
একইসঙ্গে কলকাতার জলাভূমি ভরাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও বর্তমান মন্ত্রীর কাছে কড়া পদক্ষেপের আবেদন জানান প্রাক্তন পুরমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, পুরনো ইমারতের ধ্বংসাবশেষ ফেলে বেআইনিভাবে জলাভূমি বোজানোর প্রবণতা রুখতে প্রশাসন ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু আপনার যে উদ্যম দেখছি, তাতে আপনি এই বেআইনি কাজ বন্ধ করতে পারবেন বলেই বিশ্বাস করি।”ফিরহাদের প্রশংসার জবাব দিতে দেরি করেননি অগ্নিমিত্রা পালও। তিনি বলেন, “প্রাক্তন মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছেন যে আমি সারাদিন শহরের জন্য কাজ করছি।” তবে এরপরই তিনি তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর দাবি, এত বছর ক্ষমতায় থেকেও জল জমা, নিকাশি ব্যবস্থা এবং নাগরিক পরিষেবার স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি আগের সরকার। বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বিজেপি সরকারের আমলে কোনও পক্ষপাতিত্ব হবে না।
এদিন বাজেট আলোচনায় শহরকে আরও পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করে তোলার লক্ষ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কথাও ঘোষণা করেন পুরমন্ত্রী। প্রতিটি বাড়ি থেকে আবর্জনা সংগ্রহ বাধ্যতামূলক করা, ময়লার গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকিং, আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে রাজ্যজুড়ে ‘স্বচ্ছ অ্যাপ’ চালু, বাজার ও মন্দিরের ফুল পুনর্ব্যবহার করে ধূপকাঠি ও আবীর তৈরি, কচুরিপানা দিয়ে হস্তশিল্প উৎপাদন, প্লাস্টিক বোতলের জন্য ‘বটল ক্রাশার’ প্রকল্প, ১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রকাশ্যে থুতু ফেলা ও প্রস্রাবের বিরুদ্ধে কড়া জরিমানা, আবাসনে বাধ্যতামূলক বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, ইউআইডিএফ তহবিলে কলকাতায় রিং রোড নির্মাণ এবং কলেজ স্ট্রিটকে লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ‘মা আহার’ প্রকল্পে ডিম, মাছ ও নিরামিষ খাবার যুক্ত করার পাশাপাশি বসে খাওয়ার ব্যবস্থাও চালু করার ঘোষণা করা হয়েছে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal