দেবরীনা মণ্ডল সাহা, কলকাতা :- ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার বাংলার ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। এবার সরকারের ১০০ দিন পূর্তিকে সামনে রেখে জনসংযোগে জোর দিতে চলেছে শাসকদল। আগামী ১৮ আগস্ট, মঙ্গলবার ১০০ দিনে পা দেবে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার। এই উপলক্ষে শুধু আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, সরকারের কাজের খতিয়ান সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।সরকারের ১০০ দিনের কাজের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রকাশ করা হয়েছে ৪১ পাতার একটি বই—‘পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সংকল্প এবং সাফল্যের ১০০ দিন’। দলীয় পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে এই বই তুলে দেওয়া হবে। রবিবার নিউটাউনে আয়োজিত প্রশিক্ষণ শিবির থেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং সরকারি পরিষেবার ক্ষেত্রে একাধিক সংস্কারের দাবি করেছে নতুন সরকার। বিগত সরকারের ‘কাটমানি’ সংস্কৃতি বন্ধ করা, রাজ্যে বিনিয়োগ আনা এবং সরকারি চাকরিতে স্বচ্ছতা ফেরানোকে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ১০০ দিনের সাফল্যের বইয়ে সেই সব পদক্ষেপের বিস্তারিত খতিয়ান রয়েছে।বিনিয়োগ, সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসনিক সংস্কার, মহিলা সুরক্ষা এবং আর্থিক ক্ষমতায়নের মতো বিভিন্ন বিষয় বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। রাজ্যে কত বিনিয়োগ এসেছে, কত মানুষ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কী কী পরিবর্তন করা হয়েছে, তারও হিসাব দেওয়া হয়েছে।১০০ দিন পূর্তির আগেই পুরুলিয়ায় বড় প্রকল্পের উদ্বোধন করেছে রাজ্য সরকার। সোমবার মানবাজারে জাপানের সংস্থা জাইকার আর্থিক সহযোগিতায় ১২৯৬.২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি পানীয় জল প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পের মাধ্যমে বরাবাজার, মানবাজার-১, পুরুলিয়া-১, পুঞ্চা ও আরষা ব্লক এবং পুরুলিয়া পুরসভার মোট ৮৭,২৭১টি পরিবার উপকৃত হবে। প্রায় ৮ লক্ষ ১৩ হাজার মানুষ দৈনিক জনপ্রতি ৭০ লিটার পরিশোধিত পানীয় জল পাবেন বলে জানানো হয়েছে।এর পাশাপাশি মনসা পুজো উপলক্ষে পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রকের সঙ্গে ৩৯ হাজার কোটি টাকার নতুন চুক্তির কথাও তুলে ধরা হয়েছে সরকারের তরফে।১০০ দিনের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাজ্যের ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে জুলাই মাসের ৩ হাজার টাকা করে ভাতা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। অগস্ট থেকে বার্ধক্য, বিধবা ও দিব্যাঙ্গ ভাতাও ৫০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও একাধিক পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। ‘আয়ুষ্মান ভারত’ ও ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বীমা যোজনা’র মাধ্যমে দেড় কোটির বেশি পরিবারকে বছরে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্যাশলেস চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি প্রাথমিক স্কুলের মিড-ডে মিলের বরাদ্দ ১০ টাকা এবং হাসপাতালে রোগীদের দৈনিক খাদ্য বরাদ্দ ৫৬.৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা করার ঘোষণা করা হয়েছে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে স্কুল সার্ভিস কমিশন, পিএসসি এবং পুলিশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মেধার ভিত্তিতে প্রায় ১ লক্ষ নতুন নিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। জঙ্গলমহলে ৩০ লক্ষ নতুন প্রধানমন্ত্রী আবাসের বাড়ি তৈরির পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
এছাড়াও ‘বিকশিত ভারত’ প্রকল্পের মাধ্যমে ১২৫ দিনের নিশ্চিত কাজের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শ্রমিকদের বছরে ৩৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত আয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে দাবি সরকারের।
শিল্প ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে জঙ্গলমহলের রঘুনাথপুরে ৪ হাজার কোটি টাকার ‘অমিত মেটালিক্স’ প্রকল্পের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রকল্পে স্থানীয় প্রায় ১০ হাজার অদক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি কুড়মি বোর্ডের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং কুড়মালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।তোলাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও তুলে ধরছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের ৯ মে সরকারের এক বছর পূর্তিতে তিনি নিজেই প্রকাশ্যে সরকারের ‘পারফরম্যান্স রিপোর্ট কার্ড’ পেশ করবেন। তাঁর বক্তব্য, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে মানুষের কাছে ক্ষমা চাইতেও তিনি পিছপা হবেন না| সব মিলিয়ে, সরকারের ১০০ দিন পূর্তিকে ঘিরে উৎসবের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছে সরকারের কাজের খতিয়ান তুলে ধরাকেই এখন মূল লক্ষ্য করেছে বিজেপি নেতৃত্ব।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal