দেবরীনা মণ্ডল সাহা, কলকাতা :- সরকারি প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং সাধারণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পৌঁছে দিতে বড়সড় সিদ্ধান্ত নিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। এবার থেকে রাজ্যের সমস্ত সরকারি কাজ, উন্নয়নমূলক প্রকল্প এবং বিভিন্ন সরকারি স্কিমের সাইনবোর্ড, হোর্ডিং ও জনসাধারণের জন্য প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হল। পাহাড়ি এলাকায় অবশ্য বাংলার পাশাপাশি নেপালি ভাষায় তথ্য দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। নবান্নের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, আগামী ৩০ নভেম্বর, ২০২৬-এর মধ্যে পুরনো নিয়মে তৈরি সমস্ত বোর্ড পরিবর্তন বা সংশোধন করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন নির্দেশ কার্যকর করার জন্যও বলা হয়েছে।নবান্নের মুখ্যসচিবের দফতর থেকে জারি করা নির্দেশিকায় সরকারি প্রকল্পের সাইনবোর্ডের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। কোনও এলাকায় কী ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ চলছে, কোন প্রকল্পের আওতায় তা হচ্ছে, কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কোন সংস্থা কাজের দায়িত্বে রয়েছে এবং কাজ শেষের সম্ভাব্য সময়সীমা কত—এই সমস্ত তথ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছে দেওয়াই সাইনবোর্ডের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রশাসনের নজরে এসেছে, বিভিন্ন জেলায় কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থসাহায্যে পরিচালিত প্রকল্প এবং ফিন্যান্স কমিশনের অনুদানে হওয়া কাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় শুধুমাত্র ইংরেজিতে বোর্ড লাগানো হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতেই এবার ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কড়া অবস্থান নিল রাজ্য।নতুন নির্দেশ অনুযায়ী, রাজ্যের সমস্ত সরকারি দফতর, ডিরেক্টরেট, বিধিবদ্ধ সংস্থা, উন্নয়ন পর্ষদ, স্থানীয় প্রশাসন, পঞ্চায়েত ও পুরসভা এলাকায় সরকারি কাজের সাইনবোর্ড এবং হোর্ডিংয়ে বাংলা ভাষায় যাবতীয় তথ্য উল্লেখ করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে প্রকল্পের নাম, কাজের বিবরণ, আনুমানিক ব্যয়, অর্থের উৎস, কাজ শুরুর ও শেষের তারিখ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার যোগাযোগের বিবরণ।
তবে পাহাড়ি এলাকার জন্য থাকছে পৃথক ব্যবস্থা। দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার পাহাড়ি অঞ্চল এবং গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (GTA) আওতাভুক্ত এলাকায় সাইনবোর্ড ও সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নেপালি ভাষার ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনে নেপালির পাশাপাশি বাংলা ভাষাও রাখা যাবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী ইংরেজি বা হিন্দি ভাষায় তথ্য প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা থাকলে সেই ভাষাও ব্যবহার করা যাবে। তবে বাংলা বা নেপালির পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাষা হিসেবেই ইংরেজি কিংবা হিন্দিকে রাখতে হবে। বোর্ডে বাংলা বা নেপালি ভাষাকে প্রথম ও প্রধান স্থান দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নির্ধারিত নকশা ও অন্যান্য শর্তও অপরিবর্তিত রাখতে হবে। শুধু সাইনবোর্ডেই নয়, নতুন টেন্ডার সংক্রান্ত নথি, ওয়ার্ক অর্ডার এবং স্যাংশন অর্ডারেও এই নির্দেশিকা মেনে চলার কথা জানানো হয়েছে।সময়সীমা নিয়েও স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে নবান্ন। যেসব প্রকল্পের কাজ চলছে অথচ এখনও কোনও সাইনবোর্ড লাগানো হয়নি, সেখানেও ৩০ নভেম্বরের মধ্যে নতুন নিয়ম মেনে বোর্ড বসাতে হবে। অন্যদিকে, ইতিমধ্যে লাগানো পুরনো বোর্ডগুলিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধন বা বদলে ফেলতে হবে।
এখানেই শেষ নয়, সরকারি প্রকল্পের তথ্য আরও সহজলভ্য করতে প্রতিটি সাইনবোর্ডে এবার থেকে নির্দিষ্ট QR কোড রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যজুড়ে একটি কেন্দ্রীয় জিও-ট্যাগড স্কিম ব্যাঙ্ক তৈরির উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। অনলাইন পরিকাঠামো সম্পূর্ণ হলে সাধারণ মানুষ মোবাইল ফোনে QR কোড স্ক্যান করেই সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের ইউনিক আইডি, অনুমোদিত বরাদ্দ, অর্থের উৎস, কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, নির্ধারিত সময়সীমা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং কাজের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারবেন। এই ব্যবস্থা তৈরি ও চালু করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রাজ্যের অর্থ দফতর এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স দফতরকে।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal