নিজস্ব সংবাদদাতা,কলকাতা :- রাজ্যের বিএড কলেজগুলির শিক্ষা পরিকাঠামো ও পঠনপাঠনের মান নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। একাধিক বিএড প্রতিষ্ঠানে কার্যত পড়াশোনা ছাড়াই ডিগ্রি দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে সরব হয়েছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পরিকাঠামোহীন প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠেছে এবং শিক্ষার আড়ালে ‘ডিগ্রি বিক্রির’ চক্র চলছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে ইতিমধ্যেই প্রায় সাড়ে চারশো থেকে পৌনে পাঁচশো বিএড কলেজকে শো-কজ নোটিস পাঠানো হয়েছে।
এই পদক্ষেপের পিছনে রয়েছে একটি প্রতিবেশী রাজ্যের মুখ্যসচিবের চিঠি। পশ্চিমবঙ্গের বিএড, পলিটেকনিক, আইটিআই এবং ফার্মাসি প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য রাজ্যের পড়ুয়ারা নিয়মিত ক্লাস না করেই অর্থের বিনিময়ে ডিগ্রি নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ জানানো হয়েছিল ওই চিঠিতে। এমন প্রবণতার কারণে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ছে বলেও সতর্ক করা হয়। এরপরই নড়েচড়ে বসে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা দফতর।
জুলাই ও অগস্ট মাসে রাজ্যের ৬০২টি বিএড কলেজে একযোগে পরিদর্শন চালানো হয়। ১০০ নম্বরের নির্দিষ্ট মূল্যায়ন কাঠামোয় কলেজগুলির পরিকাঠামো, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপস্থিতি, পঠনপাঠনের পরিবেশ-সহ বিভিন্ন বিষয় যাচাই করা হয়। সেই পরিদর্শনের পর কলেজগুলির গড় স্কোর দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫১.৫ শতাংশ।
পরিদর্শনে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে ৫৩টি বিএড কলেজের কোনও বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাননি পরিদর্শকেরা। কোথাও বাড়ি বন্ধ, কোথাও আবার ওই ঠিকানায় অন্য ধরনের কাজকর্ম চলতে দেখা গিয়েছে।আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে একই ঠিকানায় একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। ১৭টি ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট বা ড্রয়িং রুমের ঠিকানা ব্যবহার করে বিএড কলেজের এনওসি নেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে। একই ভবনে কখনও বিএড, কখনও পলিটেকনিক, আবার কখনও ফার্মাসি কলেজের নামের বোর্ড ঝোলানোর অভিযোগও রয়েছে।মূল্যায়নে ১১৪টি কলেজ ১০০-র মধ্যে ৩০-এরও কম নম্বর পেয়েছে। সব মিলিয়ে ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘অচল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১২১টি কলেজের পরিকাঠামো নিয়েও গুরুতর ঘাটতি ধরা পড়েছে। তুলনায় মাত্র ১৫১টি কলেজ ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানগুলিতে সিসিটিভি, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক বলে পরিদর্শনে উঠে এসেছে।
বিএড ডিগ্রি নিয়ে অন্য রাজ্যের পড়ুয়াদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ৬২ হাজার বিএড ডিগ্রি তৈরি হয়। বাংলা মাধ্যমের বিভিন্ন কলেজে গোয়া, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে পড়ুয়ারা ভর্তি হলেও নিয়মিত ক্লাস করেন না বলে অভিযোগ। পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে ডিগ্রি নিয়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে বলেও দাবি মন্ত্রীর।বিশেষ করে গোয়া থেকে আসা কোঙ্কণীভাষী পড়ুয়ারা কী ভাবে বাংলা মাধ্যমের বিএড কলেজে নিয়মিত ক্লাস না করেই ডিগ্রি অর্জন করছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের প্রবণতা শিক্ষার মানের পাশাপাশি গোটা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।শো-কজ করা কলেজগুলিকে অবশ্য নিজেদের বক্তব্য জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ন্যাচারাল জাস্টিসের নীতি মেনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলিকে ২১ দিনের মধ্যে ঘাটতি পূরণ করে জবাব দিতে বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না মিললে অনুমোদন বাতিল বা ডি-অ্যাফিলিয়েশন এবং ভর্তি বন্ধ করার মতো কঠোর পদক্ষেপ করা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী।মন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, শিক্ষাকে কোনওভাবেই ব্যবসার পণ্যে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। বিএড শিক্ষার নামে অনিয়ম বা ডিগ্রি কেনাবেচার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেই বার্তা শিক্ষা দফতরের।
Hindustan TV Bangla Bengali News Portal